লেখকঃ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান খান
কিশোরগঞ্জ জেলার ইসলামী মূল্যবোধ ও তাহজিব-তমদ্দুন রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারী ছয়জন শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিত্ব।
উনবিংশের শেষ থেকে একবিংশ শতাব্দীর সুচনা লগ্ন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি , সামাজিক পরিসর ও রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন ছয়জন বিদগ্ধ আলেমে দ্বীন। যারা ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী আলেম। যাদের খ্যাতি ও অর্জন ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমান হারে। এককথায় তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হত কিশোরগঞ্জের সার্বিক নেতৃত্ব। তাদেরকেই আমি মনে করি সিক্স সুপার ওলামা অব কিশোরগঞ্জ। আমি একে একে তুলে ধরছি তাদের অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। আজকের এই লেখাটি পরবর্তিতে হয়ত আমায় তাদেরকে নিয়ে ব্যাপক গবেষণা পূর্বক পুস্তক লেখায় সহায়তা করবে ইনশাআল্লাহ।
১. মাওলানা আতহার আলী (রহঃ):
যিনি ছিলেন শায়খুল ইসলাম নামে খ্যাত। সিলেট থেকে আগত কিশোরগঞ্জের প্রাণপুরুষ। ঐতিহাসিক শহীদী মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা খতিব ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা। ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম নেজামে ইসলামী (নিকিল পাকিস্তান) পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কিশোরগঞ্জ থেকে নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে খ্যাতিমান আলেমে দ্বীন। বরেণ্য রাজনৈতিক লিডার।
২. মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন (রহঃ):
বি.বাড়িয়া থেকে আগত এক বিদগ্ধ আলেম। যার ইলমের প্রখরতা, কর্মের দৃঢ়তা কিশোরগঞ্জবাসী মনে রাখবে দীর্ঘকাল। তিনি ছিলেন বরেণ্য রাজনীতিবীদ। নেজামে ইসলামী (নিকিল পাকিস্তান) পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম, ঐতিহ্যবাহী হয়বতনগর এ ইউ কামিল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল।
৩. মাওলানা আহমদ আলী খান (রহঃ):
কিশোরগঞ্জের খা সাব হুজুর নামে পরিচিত এক খ্যাতিমান আলেমে দ্বীন। ওলীয়ে কামেলের সকল গুণের অধিকারী এক নিরব আল্লাহর ওলী। কিশোরগঞ্জের সর্বস্তরেই যিনি ছিলেন সমাদৃত। ঐতিহাসিক শহীদী মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। যাকে বলা হত আজীবন প্রিন্সিপাল। এছাড়াও তিনি ছিলেন তাসাউফের এক মহান সাধক।
৪. মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহঃ):
কিশোরগঞ্জের খান সাব হুজুর বলে খ্যাত এক বিদগ্ধ আলেমে দ্বীন। যাকে বলা হত খতিবে মিল্লাত। পিতা মাওলানা আহমদ আলী খানের মতই কিশোরগঞ্জের ইতিহাসে সর্বমহলেই সমাদৃত এক প্রভাবশালী আলেম। যিনি ছিলেন একজন বরেণ্য রাজনৈতিক লিডার, নেজামে ইসলামী (নিকিল পাকিস্তান) পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির ব্যক্তিগত সচিব ও পার্টির মুখপাত্র। সাপ্তাহিক তানজিম বার্তার সম্পাদক। কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাবোর্ড বেফাক এর মহাসচিব ও সিনিয়র সহসভাপতি, কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে নির্বাচিত (বিএনপি মনোনীত) জাতীয় সংসদ সদস্য, ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসা ও মিরপুর আনোয়ারুল উলুম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শহীদী মসজিদের পেশ ইমাম, আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল, জামিয়া ফারুকিয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সমাদৃত এক উস্তাজুল ওলামা। কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে চিরস্মরণীয় আদর্শ নেতা।
৫. মাওলানা আবুল খায়ের মুহাম্মদ নুরুল্লাহ (রহঃ):
কিশোরগঞ্জ জেলার প্রভালশালী মহলের শীর্ষ স্থানীয় একজন। তিনি ছিলেন নুরুল্লাহ হুজুর নামে খ্যাত। শতাধিক গ্রন্থের লেখক, ভাষাবিদ, দার্শনিক ও ফিকাহের পন্ডিত। তিনি ছিলেন ঐতিহ্যবাহী হয়বত নগর এ ইউ কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম, এছাড়াও তিনি সাময়িক সময়ের জন্য ঐতিহাসিক শহীদী মসজিদের খতিব ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
৬. মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার শাহ (রহঃ):
কিশোরগঞ্জের শাহ সাব হুজুর নামে পরিচিত এক বিদগ্ধ আলেমে দ্বীন। যাকে বলা হয় আলেমকুল শীরুমনি ও উস্তাজুল ওলামা। তিনি পিতা মাওলানা আতহার আলীর মতই ছিলেন তুখোড় আলেমে দ্বীন। পিতার প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক শহীদী মসজিদের খতিব ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার প্রিন্সিপাল হিসেবে জীবনের শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন বেফাক এর সহসভাপতি।
এই ছয় জন আলেমের দ্বারা গোটা কিশোরগঞ্জ নিয়ন্ত্রিত হত। এক কথায় কিশোরগঞ্জের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও প্রশাসন সবই চলত তাদের সাথে সমন্বয় সাধন করে। ফলে কিশোরগঞ্জ ছিল শিরক, বিদয়াত, অনৈতিক, অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও অশ্লীলতা মুক্ত এক সোনার জেলা। তারা ছিলেন কিশোরগঞ্জের হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকলের অভিভাবক। আজ কিশোরগঞ্জের প্রতিটি মানুষ কোন না কোন ভাবে স্মরণ করে তাদেরকে নিরবে নিভৃতে। পরিশেষে এটুকুই বলব যে, মহান আল্লাহ তার এই ওলীদেরকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাদের অসমাপ্ত কাজগুলো যোগ্য উত্তরসূরীদের মাধ্যমে যথাযথ ভাবে আঞ্জাম দেওয়ার তাওফিক দিন, আমীন।